
মানের কাঁধে ভর করেই দু’বার চ্যাম্পিয়ন সেনেগাল।
মহাপুরুষ কিংবা নায়ক হতে হলে ঠিক কী করতে হয়? নশ্বর পৃথিবীর ইতিহাসে বহু রথী-মহারথী কতভাবেই তো স্মৃতির পাতায় অম্লান হয়ে আছেন। তবে জগৎ যদি হয় ফুটবলের, তখন ঠিক কোন পাল্লায় মেপে আপনি কাউকে মহানায়ক বলবেন? গোলের খেলা ফুটবলে শুধু গোল করেই কী মহাপুরুষ হওয়া যায়? জটিল মনে হওয়া এই প্রশ্নের জবাব অনেক আগেই দিয়ে গেছেন কিংবদন্তি দিয়াগো ম্যারাডোনা। তবে যাকে নিয়ে এত আলাপ তাঁর সঙ্গে আর্জেন্টাইন কিংবদন্তির তুলনা চলে না। কিন্তু নিজ দেশে মহাপুরুষ হওয়ার মতো অসংখ্য কীর্তি তাঁর ঠিকই আছে।
মহাপুরুষ আর মহানায়কের আলাপ একপাশে রেখে মহানাটকীয় এক ফাইনালের বিশেষ মুহূর্তে নজর দেওয়া যাক। মহাদেশীয় শ্রেষ্ঠত্বের প্রতিযোগিতায় আফ্রিকা কাপ অব নেশনসের (আফকন) মহারণে তখন টান টান উত্তেজনা। টুর্নামেন্টের আয়োজক মরক্কো প্রায় অর্ধশতাব্দী পর আবার সেরার মুকুট থেকে কেবল একটি ঠিকঠাক শটের দূরত্বে। ৯০ মিনিটের লড়াই শেষ হয়ে আট মিনিটের যোগ করা সময়েরও অন্তিম মুহূর্ত।
রাবাতের প্রিন্স মুলে আবদেল্লাহ স্টেডিয়ামে সমর্থকদের বুনো উল্লাসের উপলক্ষ্য এসে গেল হঠাৎ। পেনাল্টির বাঁশি বাজিয়েছেন রেফারি। এর আগে সেনেগালের ডিফেন্ডার ইসমাইল সারের একটি গোল বাতিল হওয়ায় পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
সবকিছুর শুরু মরক্কোর নেওয়া একটি কর্নার থেকে। কর্নার থেকে নেওয়া শট উড়ে যাচ্ছিল দূরের পোস্টে, সেখানেই ফাউলের শিকার হন রিয়াল মাদ্রিদ ফরোয়ার্ড ব্রাহিম দিয়াজ। ভিএআরের মনিটরে চোখ দেন রেফারি। সাইডলাইনে তাঁকে ঘিরে ধরে সবাই, ভিড়ের মাঝেই যাচাই করে পেনাল্টির সিদ্ধান্ত জানান তিনি।
কিন্ত রেফারির সিদ্ধান্ত কোনোভাবেই মানতে না পারা সেনেগালের কোচ নজিরবিহীন ঘটনার জন্ম দেন। ‘লায়ন্স অব তেরাঙ্গাদের’ কোচ পাপ ঝাও খেলোয়াড়দের মাঠ ছাড়ার ইশারা দেন। খানিক পর টানেল ধরে চলেও যায় তারা, রয়ে যান কেবল দলটির তারকা ফুটবলার সাদিও মানে। এরপরের গল্প শুধুই ফুটবলের দূত, আফ্রিকার গর্ব, সেনেগালের মহানায়কের।
ক্ষুদ্ধ সেনেগাল খেলোয়াড়রা তখন ড্রেসিংরুমের পথ ধরছেন। মানেকে তখন দেখা যায় গোলকিপার এদুয়ার্দো মেন্ডির সহায়তায় সবাইকে আবার মাঠে ফিরিয়ে আনছেন। ১৬ মিনিটের অদ্ভুত বিরতির পর দিয়াজের পানেনকা পেনাল্টি মিস। পরে অতিরিক্ত সময়ে পাপে গেয়ের চমৎকার গোল। শেষ পর্যন্ত তার গোলেই দ্বিতীয়বারের মতো আরেকটি চ্যাম্পিয়ন ট্রফি ঘরে তোলে সেনেগাল।
দিয়াজের সেই মিস আর পাপের জয়সূচক গোলটি নিয়েই তো যত মাতামাতি হওয়ার কথা। তবে গোল মিস আর গোল করা, সব ছাপিয়ে আলোচনায় সেনেগালের আর ফুটবলেরই পথপ্রদর্শক হয়ে যাওয়া সাদিও মানে। লিভারপুলের সাবেক এই ফুটবলারে মনে তখন কি চলছিল?
ম্যাচ শেষে ৩৩ বছর বয়সী ফরোয়ার্ড মানের মুখ থেকে মুক্তোর মতো ঝরে পড়া সেই কথা যেন ফুটবলেরই অমর বাণী। একটি ম্যাচের নেহাৎ হার-জিত কিংবা একটি শিরোপাকে অতিক্রম করে মানে যেন গাইলেন ফুটবলের জয়গান, ‘ফুটবল একটি বিশেষ ব্যাপার। সারা বিশ্ব দেখছিল, বিশ্ব ফুটবলকে ভালোবাসে। আমার মনে হয় ফুটবল একটি আনন্দের খেলা, তাই ফুটবলের জন্য আমাদের ভালো একটি ভাবমূর্তি তুলে ধরতে হবে। শুধু একটি পেনাল্টির সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ হয়ে ম্যাচ না খেলাটা একেবারেই পাগলাটে হতো। বিশেষ করে আফ্রিকান ফুটবলের জন্য সেটা হতো সবচেয়ে বাজে উদাহরণ।’
এরপর মানে যা বললেন, সেটা শুধু ফুটবলপ্রেমী নয় অন্তত হার-জিত বোঝেন এমন নিরপেক্ষ সমর্থকের মনে চিরকালের জন্য গেঁথে যাওয়ার কথা। ফেরা যাক মানের অমৃত বাণীর কাছে, ‘এই ধরনের ঘটনা ফুটবলে ঘটার চেয়ে আমি হার মেনে নেওয়াকেই বেশি পছন্দ করব।
এটা খুবই খারাপ পরিস্থিতি ছিল। ফুটবল তো দশ মিনিটের জন্যও থামার কথা নয়। কিন্তু আমাদের আর কোনো উপায় ছিল না—যা হয়েছে, তা মেনে নিতে হয়েছে। তবে ইতিবাচক দিক হলো, আমরা ফিরে এসে ম্যাচটা শেষ করেছি, আর এরপর যা ঘটেছে, তা ঘটে গেছে।’
আফকনের এই সংস্করণই শেষ মানের। এমনটাই ঘোষণা দিয়েছিলেন সেনেগাল তারকা। বিদায়ের এই মঞ্চ এভাবেও যে রাঙানো যায়, সেটা মানেকে না দেখে থাকলে বিশ্বাস হওয়া কঠিনই। উদার-মহানুভব ফুটবলার হিসেবে পরিচিত মানের এমন রাজসিক বিদায় ছুঁয়ে গেছে অনেকের হৃদয়।
সাদিও মানের ভূয়সী প্রশংসা করে নাইজেরিয়ার সাবেক ফুটবলার ড্যারিয়েল আমোকাচি বিবিসিকে বলেছেন, ‘মানে তার দলের খেলোয়াড়দের মাঠে ফেরাতে সীমার বাইরে গিয়ে চেষ্টা করেছেন, এবং সফল হয়েছেন। কি অসাধারণ একজন ফুটবলের দূত তিনি। আমরা জানি, মাঠের বাইরে তিনি কেমন মানুষ এবং তিনি ফুটবলকে সত্যিই বোঝেন।’
যে মরক্কোকে হারিয়ে সেনেগাল চ্যাম্পিয়ন হলো সেই দলেরই সাবেক ফুটবলার হাসান কচলৌল বলেন, ‘আফ্রিকার ফুটবল এবং বিশ্বের ফুটবল কিছুটা হেরে যাচ্ছিল, যতক্ষণ না মানে হস্তক্ষেপ করলেন। যা আমার সবচেয়ে ভালো লেগেছে, সেটি হলো, সেনেগালের দলে কেবল একজন খেলোয়াড়ই ছিলেন—সাদিও মানে। আর এটাই প্রমাণ করে তিনি কত বড় মনের মানুষ।’
এবার এই বিশেষ ফুটবল দূত মানের ক্যারিয়ারটা নাহয় দেখে আসা যাক। সাদিও মানের গল্পের শুরু বামবালিতে—দক্ষিণ-পশ্চিম সেনেগালের এক প্রান্তিক গ্রামে। লাল-মাটি ধুলোয় ভরা রাস্তা আর বালি-মাখা মাঠেই তার ফুটবলের প্রথম পাঠ।
মাত্র ১৩ বছর বয়সে টেলিভিশনের পর্দায় তিনি দেখেছিলেন ২০০৫ সালের চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ফাইনাল—ইস্তাম্বুলে এসি মিলানের বিপক্ষে লিভারপুলের সেই ঐতিহাসিক কামব্যাক। সেদিনের ম্যাচ যেন তার স্বপ্নের দিকনির্দেশক হয়ে ওঠে।
তারপর সময় অনেক গড়িয়েছে। সেই কিশোরই একদিন জিতেছেন ইউরোপের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ট্রফি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ, লিভারপুলের সঙ্গে তুলে ধরেছেন প্রিমিয়ার লিগ শিরোপাও। জাতীয় দলের জার্সিতে ‘তেরাঙ্গা লায়ন্স’-এর হয়ে জিতলেন দুটি আফ্রিকা কাপ অব নেশনস।
২০২১ সালের আফকন ফাইনালে মিসরের বিপক্ষে টাইব্রেকারে জয়সূচক পেনাল্টিটি মানে বর্ণনা করেছিলেন এভাবে, ‘এটাই আমার জীবনের সেরা দিন, আমার জীবনের সেরা ট্রফি।’ সেই ঐতিহাসিক সাফল্যের স্বীকৃতি হিসেবে তার জন্মভূমি থেকে মাত্র ২০ কিলোমিটার দূরের সেদিউ শহরে একটি স্টেডিয়ামের নাম রাখা হয় সাদিও মানের নামে।
ভিয়াররিয়ালের মিডফিল্ডার ও সেনেগাল সতীর্থ পাপে গেয়ে মনে করেন, গল্পটা এখানেই শেষ হওয়া উচিত নয়। গেয়ে জানান, দলের লক্ষ্য হলো—যাকে তিনি ‘সেনেগালের কিংবদন্তি’ বলে আখ্যা দিয়েছেন—মানেকে অন্তত আরও একবার সিদ্ধান্ত বদলাতে রাজি করানো এবং ২০২৭ সালে কেনিয়া, তানজানিয়া ও উগান্ডায় অনুষ্ঠিত আফকনেও তাঁকে দলে রাখা।
সেনেগাল আর আফ্রিকা ছাপিয়ে ফুটবলেরই একজন ঝাণ্ডাবাহক হয়ে যাওয়া সাদিও মানের মতো ফুটবলারকে তো অন্ততকাল দরকার ক্রীড়ার এই অঙ্গনে। ইতিহাসে কজন ফুটবলার এই খেলাকে অন্তরে এভাবে ধারণ করতে পারেন? অবসরের সিদ্ধান্ত সাদিও মানের একান্তই নিজের। তবে আমার আপনার মতো অসংখ্য ফুটবলপ্রেমী শুধু বলে যেতে পারি, ‘ধন্য মানে, তোমাকে পেয়ে ধন্য ফুটবল।’