চরম নাটকীয়তার পর মরক্কোর স্বপ্ন ভেঙে চ্যাম্পিয়ন সেনেগাল

চরম নাটকীয়তার পর মরক্কোর স্বপ্ন ভেঙে চ্যাম্পিয়ন সেনেগাল

রোমাঞ্চ, উত্তেজনা, বিতর্ক, নাটকীয়তা এমন সব শব্দও যেন অপ্রতুল হয়ে গেল। অবিশ্বাস্য আর নজিরবিহীন ঘটনার স্বাক্ষী হলো আফ্রিকা কাপ অব নেশনস (আফকন)। মহাদেশীয় শ্রেষ্ঠত্যের মহারণের আগেই উত্তাপ ছড়ায় সেনেগালের অভিযোগে। শিরোপার মঞ্চে নেমে রেফারির সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানিয়ে সেনেগালের মাঠ ছাড়া, তারপর একজন আর্দশ নেতার ভূমিকায় অবর্তীণ হয়ে দলকে ফিরিয়ে আনা সাদিও মানে, মহাগুরুত্বপূর্ণ সময়ে মরক্কোর ফরোয়ার্ড ব্রাহিম দিয়াজের পেনাল্টি মিস, সবশেষ পাপ গেয়ির গোলে স্বাগতিকদের হতাশার মহাসমুদ্রে ভাসিয়ে সেনেগালের চ্যাম্পিয়ন হওয়া। আফ্রিকার সঙ্গে ফুটবলবিশ্ব দেখল এমনই এক মহাকাব্যিক ফাইনাল।

মরক্কোর রাজধানী রাবাতে নাটকীয়তার সব সীমা ছাড়িয়ে যাওয়া আফ্রিকা কাপ অব নেশনসের ফাইনালে মরক্কোর বিপক্ষে ১-০ গোলের জয়ে চ্যাম্পিয়ন সেনেগাল।  নির্ধারিত সময়ে গোলশূন্য সমতার পর অতিরিক্ত সময়ের চতুর্থ মিনিটে একমাত্র গোলটি করে আফকনে সেনেগালের দ্বিতীয় শিরোপা জয়ের নায়ক বনে যান ভিয়ারিয়ালের মিডফিল্ডার পাপ গেয়ি।

দ্বিতীয়বার আফকনের শিরোপা জিতল সেনেগাল। ২০২১ সালে সাদিও মানের দল প্রথমবার এই প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন হয়। আর ১৯৭৬ সালে আফ্রিকার সেরা হওয়ার পর আর এই ট্রফি জেতা হলো না মরক্কোর। মাঝে ২০০৪ আসরের ফাইনালে তিউনিসিয়ার কাছে হেরে স্বপ্নভঙ্গ হয় মরক্কোর। এবার নিজেদেরে উঠানে ট্রফি জয়ের সবধরনের প্রস্তুতিই যেন সেরে নিয়েছিল আশরাফ হাকিমিরা। তবে তাদের পঞ্চাশ বছরের বেশি সময়ের অপেক্ষা আরও দীর্ঘই হলো।

ঘটনাবহুল ফাইনালের বর্ণনার শুরুটা ৯০ মিনিটের পর থেকেই করা যাক। প্রায় সমানতালে লড়ে যাওয়া মরক্কো-সেনেগাল গোলশূন্য থেকে নির্ধারিত সময় শেষ করে। অনেকেই তখন ধরে নিয়েছিলেন ম্যাচ গড়াচ্ছে অতিরিক্ত সময়ে। তবে যোগ করা সময়ের ৯৮ মিনিটে ঘটে বিপত্তি। পেনাল্টি পেয়ে যায় মরক্কো।  মরক্কোর নেওয়া কর্নারে বল উড়ে যাচ্ছিল দূরের পোস্টে, সেখানেই ফাউলের শিকার হন রেয়াল মাদ্রিদ ফরোয়ার্ড দিয়াস।

রেফারি জ্যাঁ জাক নডালা ভিএআরের পরামর্শে সাইডলাইন মনিটরে গিয়ে রিপ্লে দেখে ব্রাহিম দিয়াজকে ফাউল করার দায়ে ডিফেন্ডার এল হাজি মালিক দিয়ুফের বিরুদ্ধে পেনাল্টির সিদ্ধান্ত দেন। আর রেফারির এই সিদ্ধান্তই শুরু হয় নাট্যমঞ্চের প্রথম পর্ব।

কিছুক্ষণ আগেই সেনেগালের একটি গোল বাতিল হওয়ায় ক্ষুব্ধ থাকা প্রধান কোচ পাপে থিয়াও নিজের খেলোয়াড়দের মাঠ ছাড়তে বলেন। সেনেগালের অর্ধেকের বেশি খেলোয়াড় মাঠ ছেড়ে বেরিয়ে যায়। তবে তারপর দেশটির ‘নেশনাল হিরো’ মানে সবশেষ হয়ে যাওয়ার আগেই বুঝিয়ে শুনিয়ে ফিরিয়ে আনেন সতীর্থদের। প্রায় ১৭ মিনিটের বিরতির পর শেষ পর্যন্ত খেলোয়াড়রা আবার মাঠে ফেরেন।

রিয়াল মাদ্রিদের ফরোয়ার্ড দিয়াজ, যিনি পাঁচ গোল নিয়ে টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ গোলদাতা ছিলেন, তাকেই দেওয়া হলো পেনাল্টিতে গোল করার গুরুদায়িত্ব। তবে পুরো গ্যালারিকে থমকে দিয়ে একটি ‘পানেনকা’ শট নেন তিনি। রিয়ালের এই ফরোয়ার্ডের শট আটকাতে তেমন নড়ারই প্রয়োজন হয়নি সেনেগালের গোলকিপার এদুয়ার মেন্দির। এরপরই বাজল সঙ্গে পূর্ণ সময় শেষের বাঁশি।

এরপর অতিরিক্ত সময়ের ৪ মিনিটে সেনেগালের মিডফিল্ডার পাপে গেয়ের গোল করেন। ম্যাচের বাকি সময় আর কোনো নাটকের সূচনা না হওয়ায় শিরোপা নিশ্চিত হয়ে যায় ‘লায়ন্স অব তেরাঙ্গাদের’।

এর আগে শিরোপা পুনরুদ্ধারের স্বপ্নে বিভোর সেনেগালের প্রথম এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ আসে ৫ মিনিটে। সতীর্থের দারুণ একটি ক্রস গোলমুখে পেয়েও জালে পাঠাতে পারেননি পাপ গেয়ি। ৩৭ মিনিটে প্রথমার্ধের সেরা সুযোগটি পায় সেনেগাল। গোলকিপারকে একা পেয়ে যান ইলিমান; তবে তার কোনকুনি শট এগিয়ে এসে পা বাড়িয়ে আটকে দেন ইয়াসিন বোনো।

এর চার মিনিট পর দারুণ এক সুযোগ পায় মরক্কোও। কিন্তু বাঁ দিক থেকে ইসমায়েল সাইবারির দুর্দান্ত ক্রস ডি-বক্সে ফাঁকায় পেলেও, বলে মাথা ছোঁয়াতেই পারেননি নায়েফ।

প্রথমার্ধে গোলের জন্য মাত্র দুটি শট নেওয়া মরক্কো বিরতির পরের প্রথম ১৫ মিনিটে আরও চারটি শট নেয় কিন্তু এর কোনোটিই লক্ষ্যে ছিল না। ৫৮তম মিনিটে এল কাবির কাছ থেকে বাঁ পায়ের শট অল্পের জন্য লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। পরের কয়েক মিনিটে আরও তিনবার শট নেয় মরক্কো, এবং প্রতিবারই লক্ষ্যভ্রষ্ট। ৬৭তম মিনিটে এক দুর্ঘটনারও শিকার হয় তারা; কর্নারে হেড করতে লাফিয়ে ওঠেন এল আইনাউই, প্রতিপক্ষের একজনের মাথায় লেগে চোখের ওপরের অংশে আঘাত পান তিনি, রক্তও ঝরে; কিন্তু হাল ছাড়েননি তিনি। মাঠেই কিছুক্ষণ চিকিৎসা নিয়ে, কপালে ব্যান্ডেজ বেঁধে খেলা চালিয়ে যান।

৮১ মিনিটে লক্ষ্যে প্রথম শট রাখতে সক্ষম হয় মরক্কো, তবে আব্দেলের দুর্বল ভলি সরাসরি যায় সেনেগারের গোলকিপারের গ্লাভসে। নির্ধারিত সময়ের শেষ মিনিটে ব্যবধান গড়ে দেওয়ার দারুণ সুযোগ তৈরি করে সেনেগাল; জোরাল কোনাকুনি শটে বোনোকে পরাস্ত করতে পারেননি ইব্রাহিম। খানিকটা পর ইদ্রিসা গেয়ির হেড পোস্টে লাগলে, ফিরতি বল হেডেই জালে পাঠান ইসমাইল সার; তবে গোল মেলেনি আগেই রেফারি ফাউলের বাঁশি বাজানোয়। এরপর পর ভরপুর নাটকীয়তার যোগ করা সময় আর পরিশেষে সেনেগালের স্বরণীয় চ্যাম্পিয়নের মুকুট পাওয়া।

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *